ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) অপ্রয়োজনীয়- প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি

গতবছর বিহার থেকে শুরু হয়েছে এসআইআর। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪ঠা নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গ সহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে শুরু হয়েছে এই সংশোধন প্রক্রিয়া। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি ভোটার তালিকার এই নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়াকেই 'অপ্রয়োজনীয়' বলে মন্তব্য করেছেন। প্রত্যেক বছর নিয়মিত ভাবে ভোটার তালিকার যে সংশোধন ও সংযোজন প্রক্রিয়া চলে সেটাই যথেষ্ট বলে মনে করেন তিনি

রাজনীতিদেশ

নিতীশ কুমার মন্ডল

4/7/20261 min read

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এর কোন প্রয়োজন নেই। যেখানে প্রত্যেকবছর নিয়মিতভাবে ভোটার তালিকার সংশোধন ও সংযোজন করা হয়, সেখানে অল্পসময়ের মধ্যে এইরকম জটিল প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়িত করার কোন দরকার ছিল না বলেই মনে করেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি। সম্প্রতি ‘দ্য ওয়্যার’ এ এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

এসআইআরের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালাম, তামিলনাড়ু, আসাম ও পুদুচেরিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগেই তাড়াহুড়ো করে এসআইআর করার কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় বেশ কয়েক লক্ষ মানুষ ভোট দিতে পারবেন না। ট্রাইব্যুনালে শুনানি শেষে ৯১ লক্ষের (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ৯০লক্ষাধিক মানুষ অবৈধ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে) মধ্যে লক্ষ মানুষ হয়তো আবার বৈধ ভোটারের মর্যাদা পাবে, কিন্তু তাঁরা ২০২৬ সালের চলতি বিধানসভা নির্বাচনে আর ব্যালটবাক্সে বা ইভিএমে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। সেই দায় কি নির্বাচন কমিশন নেবে? বৈধ নাগরিকদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা দেশে গণতন্ত্রের জন্য সুখদায়ক নয় বলেও আক্রমন করেছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, কমিশনের উচিত ছিল ২০২৫ এর তালিকা অনুযায়ী পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। পাশাপাশি, এসআইআরের কাজ সমান্তরালভাবে চালানো যেত বলেও মনে করেন তিনি।

নির্বাচনের কমিশনের বিরুদ্ধে কেউ কোন অভিযোগ করলে, যদি কমিশন অভিযোগকারীর থেকে হলফনামা চাইতে পারে, তবে, নির্বাচন কমিশন কেন হলফনামা দিয়ে বলবে না যে, এসআইআরের মাধ্যমে একজন বৈধ ভোটার ও তালিকা থেকে বাদ পড়বে না। গতবছরের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি এই মন্তব্য করেন। ২০২৫ সালে রাহুল গান্ধী কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ করলে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এক সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। গান্ধীকে প্রমাণসহ হলফনামা জমা দিতে বলা হয়। শেষ পর্যন্ত যদিও রাহুল গান্ধী তা জমা করেননি।

Rahul gandhi in a press conference on Vote Theft by ECI
Rahul gandhi in a press conference on Vote Theft by ECI

এস ওয়াই কুরেশি আগেও এসআইআর নিয়ে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এস ওয়াই কুরেশি ছিলেন ১৭তম তথা দেশের প্রথম মুসলিম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। ৩০ জুলাই ২০১০ থেকে ১০ জুন ২০১২ পর্যন্ত ১৭তম ওই পদে ছিলেন তিনি। তিনি পদে থাকাকালীন ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে পালাবদল হয়। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মহাকরণের দখল নেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ১৫ বছর পরে মমতা ব্যানার্জির দলের ক্ষমতায় ফেরা কঠিন বলে মনে করছেন অনেকে। সীমাহীন দুর্নীতি, রাজ্যে আইন শৃঙ্খলার অবনতি, তৃণমূলের অত্যাচার এর পাশাপাশি এসআইআর-এর ফলে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার প্রভাব যেমন তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাবে, তেমনই একের পর এক রাজ্যে বিজেপির জয় চাপে রাখবে টিএমসিকে।

উল্লেখ্য, ২৭ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন এক সাংবাদিক বৈঠক করে পশ্চিমবঙ্গ সহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশ্যাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন) এর বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ২৮ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে এসআইআর এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ। ৪ ডিসেম্বর থেকে চলে বাড়ি বাড়ি এন্যুমারেশন ফর্ম বিতরণ। সেই দিন থেকে শুরু, চার মাস অতিক্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গে এখনও চলছে এই সংশোধন প্রক্রিয়া। অন্যান্য রাজ্যে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ন ভাবে এসআইআর-এর কাজ চললেও নানা কারণে পশ্চিমবঙ্গে এই কাজ বাধাগ্রস্থ ও বিলম্বিত হয়েছে। মানুষের পাশে থাকার লড়াইয়ের বার্তা দিতে নজিরবিহীনভাবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন, এমনকি এজলাসে দাঁড়িয়ে নিজের মতামত নিজেই বিচারকদের সামনে তুলে ধরেন। লাগাতার বিক্ষোভ ও দোষারোপের ফলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছায় যে প্রথম তালিকায় অবৈধ ভোটার হিসেবে চিহ্নিতরা নিজেদের সপক্ষে বৈধ ভোটার হওয়ার প্রমাণস্বরূপ যেসব নথি জমা দেন, সেগুলো পরীক্ষার জন্য বিচারবিভাগের আধিকারিকদের নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট। নথি পরীক্ষা ও পর্যালোচনা তত্ত্বাবধানের দায়িত্ত্ব দেওয়া হয় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালকে। এদিকে, বিচারবিভাগের আধিকারিকদের আটকে রেখে বিক্ষোভ দেখানোয় সারা দেশের সামনে আবারও মুখ পুড়েছে পশ্চিমবঙ্গের। রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়েছে ভোটের আগে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ কে। এদিকে, ২৩ এপ্রিল রাজ্যের প্রথমদফা নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দিন শেষ হয়েছে গতকাল। নির্বাচনী প্রচার সেই একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুঁড়ি চলছে চূড়ান্ত পর্যায়ে।